Search

কবিতা


দরদালানের ভিড় পার হয়ে এসে পড়ি পৃথিবী শেষের এক ভিজে মেঘের দুপুরে । নদীর ধারে ভেঙে ছড়িয়ে থাকা জগৎ সেখানে শব্দহীন । শুধু একটি সোনালী ডানার চিল উড়ে উড়ে কাঁদে। পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো যে রূপ নিয়ে চলে গেছে দূরে, যেন ডাক দেয় তাকেই ।


একসময় চিলের কান্না সঙ্গে নিয়ে দুপুর ফুরিয়ে আসে । উঁচু উঁচু হরিতকী গাছের পিছনে বিকেলের রাঙা গোল সূর্য চুপিচুপি সব ভুলে যায়, নেমে আসে শিশিরের শব্দের মত সন্ধ্যা। রৌদ্রের গন্ধ মুছে যায় চিলের ডানা থেকে, নিভে যায় পৃথিবীর সব রঙ । আলোর রহস্যময় সহোদরীর মতো এক অন্ধকার ঘন হয়ে আসে । পিপুল গাছে পেঁচা সোনার বলের মতো সূর্য দেখা শেষ করে তাকিয়ে থাকে রুপার ডিবের মতো চাঁদের বিখ্যাত মুখের দিকে । সেই নীল কস্তুরী আভার চাঁদের জ্যোৎস্না দিনের আলো নয়, উদ্যম নয়, স্বপ্ন নয় । প্রদাহ কিম্বা প্রবাহমান যন্রণাও নয় । গভীর অন্ধকারে দেখি সে পাণ্ডুর চাঁদ যেন আর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে বৈতরণীর থেকে ।


পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় । হয়ত বা নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে । নীল কস্তুরী আভার চাঁদের আহ্বানে জলা ছেড়ে পাখা মেলে উড়ে যায় বুনো হাঁসের দল । সাঁই-সাঁই শব্দ শুনি তার । এক— দুই— তিন— চার— অজস্র— অপার । রাত্রির কিনার দিয়ে তারা ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়ে এঞ্জিনের মতো শব্দে । তাদের পেছনে পড়ে থাকে নক্ষত্রের বিশাল আকাশ, আর তাদের গায়ের ঘ্রাণ । সব ধ্বনি সব রং মুছে যাওয়া পৃথিবীতে তারা উড়তে থাকে আমার হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোৎস্নার ভিতর। তাদের সঙ্গে আমিও পাড়ি দিই আরো এক দেশে । সেখানে আকাশের অন্ধকার ফাল্গুনের রাতের মতোই নিবিড় । চারিদিকে পিরামিড, কাফনের ঘ্রাণ । বালির উপরে জ্যোৎস্নায় বিচূর্ণ এশিরিয় থামের মতো খেজুর-ছায়ারা দঁড়িয়ে ইতস্ততঃ । মৃত । ম্লান। আমার শরীরে পাই মমির ঘ্রাণ।

আকাশে ছায়া ঘুম সপ্তর্ষি নক্ষত্র । তারই রূপোলী আগুনে দেখি অনন্ত রৌদের থেকে শাশ্বত রাত্রির দিকে নীরবে চলে যায় দেয় ভূমধ্যসাগরীয় কোন জাতি । গুঞ্জন করে পথ পাড়ি দিই তাদের সঙ্গে সিন্ধুর আঁধারে । তাদের গল্পে তখন নিবিড় মেরুন আলো, মুক্তার শিকারী, রেশম, মদের সার্থবাহ, দুধের মতন সাদা নারী।


পুরানো নক্ষত্রের দিন শেষ হয়, নতুনেরা আসছে বলে । মরে যাওয়া নক্ষত্রের শীতের পরশ পাই বুকের ভেতর । ঈষৎ নিভে আসে নক্ষত্রের আলোয় দেখি, তবুও সমুদ্র নীল, ঝিনুকের গায় আলপনা । দেখি আকাশের ওপারে আর এক আকাশ, বাতাসের ওপারে বাতাস । সেই বিহ্বল বাতাসে পাল তুলে সব অন্ধকার সমুদ্রের ক্লান্ত নাবিকেরা মক্ষিকার গুঞ্জনের মতো ভূমধ্যসাগরলীন দূর এক সভ্যতার থেকে ফিরে আসে । তাদের কাছে পথের সন্ধান পেয়ে পৌঁছই এক বিলুপ্ত নগরীতে । ভারতসমুদ্রের তীরে , কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে, সেই নগরী । সেখানে অনেক কমলা রঙের রোদ, অনেক কাকাতুয়া পায়রা, মেহগনির ছায়াঘন পল্লব অনেক ।


অনেক কমলা রঙের রোদ, আর একটি ধূসর প্রাসাদ । মূল্যবান আসবাবে ভরা সে প্রাসাদ সাজানো পারস্য গালিচায়, কাশ্মীরী শালে আর বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবালে। সেই প্রাসাদে অপরূপ খিলান ও গম্বুজের বেদনাময় রেখা, লুপ্ত নাসপাতির গন্ধ, অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধূসর পাণ্ডু লিপি, রামধনু রঙের কাচের জানালা, ময়ূরের পেখমের মতে রঙিন পর্দায়-পর্দায় কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের ক্ষণিক আভাস । সেখানে আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়। পর্দায়, গালিচায়, রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ । আর রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!


সহসা যেন শেষ হয়ে যায় বিকেলবেলা । ফুরিয়ে যায় কমলা রঙের রোদ ।


চোখ খুলে দেখতে পাই একটা সাদা রঙের সিলিং । সিলিঙে বসানো আলোর সারি । তাদের নিরুত্তাপ, বর্ণহীন সাদা আলো পড়ে আমার পাশে দাঁড়ানো সাদা ল্যাবকোট পরা মেয়েটার ওপর।


রিক্লাইনার থেকে উঠে বসি । বুঝতে পারি বেড়ে গেছে আমার নিঃশ্বাসের গতিবেগ ।


“কেমন লাগলো ?” একটা কৃত্রিম হাসি হেসে প্রশ্ন করে করে মেয়েটি ।


মাথা থেকে আলো টুপটাপ করা হেডব্যান্ডটা খুলে ফেরৎ দিই মেয়েটাকে । “বেশ ভালো । কত দাম এটার ?”


উত্তরে মেয়েটা যা টাকার অঙ্ক বলে তা আমার তিন মাসের মাইনের সমান ।


“নেবেন ?” আমার দিকে একটা স্ক্যানার বাড়িয়ে ধরে মেয়েটা ।


চোখ চলে যায় মেয়েটার পেছনে । সেখানে একটা দেওয়াল জোড়া জানলা । জানলার পেছনে মঙ্গলের লাল । লাল মাটি, লাল আকাশ, লাল পাহাড় । রুক্ষ, ঊষর, বন্ধ্যা, নিষ্প্রাণ ।


ফের মনে পড়ে সেই কমলা রঙের রোদের কথা । কমলা রঙের রোদ, নাশপাতির গন্ধ, রামধনু রঙের কাচের জানলা, ময়ূরের পেখমের মতো পর্দা ।


আর রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!


“এটা কোন কবির ?”


“জীবনানন্দ ।” নিরাসক্ত কন্ঠে উত্তর দেয় মেয়েটা


একটা নিঃশ্বাস ফেলে বারকোড করা কব্জীটা বাড়িয় দিই স্ক্যানারের নিচে , “হ্যাঁ, নেবো !”

================================================================

অক্টোবর ২০২১ লিখন পূজা পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা ।

(c) সুমিত বর্ধন ।

11 views0 comments